ডায়াবেটিস সুগার লেভেল চার্ট: নরমাল, বিপদজনক ও চিকিৎসা

ডায়াবেটিস সুগার লেভেল চার্ট: নরমাল, বিপদজনক ও চিকিৎসা
ডায়াবেটিসকে "নীরব ঘাতক" বা Silent Killer বলা হয় কারণ এটি অনেক সময় কোনো উপসর্গ ছাড়াই শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ অকেজো করে দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশে ডায়াবেটিস আক্রান্তের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। এই পরিস্থিতিতে নিয়মিত Blood Glucose Monitoring বা সুগার চেক করা অত্যন্ত জরুরি। একটি সঠিক সুগার লেভেল চার্ট অনুসরণ করে নিয়মিত রিডিং নিলে অকাল মৃত্যুঝুঁকি ও স্ট্রোকের মতো জটিলতা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
রক্তে শর্করার বা সুগারের স্বাভাবিক মাত্রা কত?
আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের শক্তির প্রধান উৎস হলো Glucose বা শর্করা। কিন্তু এই শর্করা রক্ত থেকে কোষে প্রবেশের জন্য একটি বিশেষ 'চাবি'র প্রয়োজন হয়, যার নাম Insulin। আমাদের পেটের পেছনের দিকে অবস্থিত Pancreas বা অগ্ন্যাশয় থেকে এই ইনসুলিন হরমোন নিঃসৃত হয়। আমরা যখন খাবার গ্রহণ করি, তখন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায় এবং অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন বেরিয়ে এসে সেই গ্লুকোজকে কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে।
রক্তে শর্করার এই ভারসাম্য বা Glucose Homeostasis বজায় রাখা শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি রক্তে দীর্ঘক্ষণ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি চিনি বা শর্করা থাকে, তবে তা রক্তনালী ও স্নায়ুর ক্ষতি করতে শুরু করে। আবার সুগার খুব বেশি কমে গেলে মস্তিষ্ক ও শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে। তাই শরীরকে সুস্থ রাখতে সুগার লেভেল একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা জরুরি। সাধারণত একজন সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে খালি পেটে সুগারের মাত্রা ১০০ mg/dL এর নিচে থাকাকে আদর্শ মনে করা হয়। এই সুক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় না থাকলে দীর্ঘমেয়াদে হার্ট, কিডনি এবং চোখের বড় ধরণের ক্ষতি হতে পারে।
সুস্থ মানুষের রক্তে সুগারের মাত্রা কি সারা দিন একই থাকে?
উত্তর: না, সুস্থ মানুষের রক্তেও সুগারের মাত্রা সারাদিন ওঠানামা করে। সাধারণত খাবার খাওয়ার পর এটি কিছুটা বৃদ্ধি পায় এবং শারীরিক পরিশ্রম বা দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলে এটি কিছুটা কমে যায়। তবে সুস্থ শরীরে এই পরিবর্তনগুলো সর্বদা একটি নির্দিষ্ট ও নিরাপদ সীমার মধ্যেই থাকে।
বয়স অনুযায়ী ডায়াবেটিস সুগার লেভেল চার্ট
ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করার মাত্রা সবার জন্য এক নয়। একজন শিশুর শরীরের চাহিদা এবং একজন সত্তরোর্ধ্ব ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে শরীরের ইনসুলিন সংবেদনশীলতা এবং মেটাবলিক রেট পরিবর্তিত হয়। তাই সঠিক চিকিৎসার জন্য আপনার বয়স অনুযায়ী আদর্শ সুগার লেভেল কত হওয়া উচিত, তা জানা অত্যন্ত জরুরি। নিচে একটি পূর্ণাঙ্গ চার্ট দেওয়া হলো যা আপনাকে আপনার বর্তমান সুগারের অবস্থা বুঝতে সাহায্য করবে:
বয়স্কদের ক্ষেত্রে সুগার লেভেল কি একটু বেশি থাকা স্বাভাবিক?
উত্তর: হ্যাঁ, বার্ধক্যে অনেক সময় চিকিৎসকরা কিছুটা শিথিল রেঞ্জ (Relaxed Range) পরামর্শ দেন। কারণ বয়স্কদের ক্ষেত্রে সুগার খুব বেশি কমে যাওয়া (Hypoglycemia) অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য চার্ট
১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রক্তে শর্করার সঠিক মাত্রা বজায় রাখা দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতার চাবিকাঠি। এই বয়সে জীবনযাত্রার অনিয়মের কারণে অনেকেই 'প্রি-ডায়াবেটিস' স্টেজে চলে যান, যা সময়মতো শনাক্ত করলে রিভার্স করা সম্ভব। নিচে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রক্তের গ্লুকোজের তিনটি প্রধান ধাপ স্পষ্টভাবে দেওয়া হলো:
১. স্বাভাবিক বা নরমাল (Normal): যদি খালি পেটে সুগার ১০০ mg/dL এর নিচে থাকে এবং খাওয়ার ২ ঘণ্টা পর ১৪০ mg/dL এর নিচে থাকে, তবে তা স্বাভাবিক।
২. প্রি-ডায়াবেটিস (Pre-diabetes): খালি পেটে ১০০-১২৫ mg/dL অথবা খাওয়ার পর ১৪০-১৯৯ mg/dL এর মধ্যে থাকলে আপনি প্রি-ডায়াবেটিস স্টেজে আছেন। এটি একটি সতর্কতা সংকেত।
৩. ডায়াবেটিস (Diabetes): খালি পেটে ১২৬ mg/dL এর উপরে অথবা খাওয়ার ২ ঘণ্টা পর ২০০ mg/dL এর বেশি হলে তাকে ডায়াবেটিস হিসেবে গণ্য করা হয়।
এই বয়সের ব্যক্তিদের বছরে অন্তত একবার রুটিন চেকআপ করা উচিত।
শিশুদের জন্য শর্করার মাত্রা
শিশুদের ক্ষেত্রে রক্তে শর্করার ব্যবস্থাপনা বড়দের তুলনায় বেশ জটিল। শিশুদের মধ্যে সাধারণত Type-1 Diabetes বেশি দেখা যায়, যেখানে শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না। এছাড়া শিশুদের Growth Period বা বাড়ন্ত বয়সে হরমোনের তীব্র পরিবর্তনের কারণে তাদের সুগার লেভেলে ঘনঘন ওঠানামা (Fluctuations) দেখা দেয়। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালে গ্রোথ হরমোন ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিদ্যায় ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বলা হয়।
শিশুদের ক্ষেত্রে সুগার লেভেল খুব বেশি কমিয়ে রাখা বিপজ্জনক হতে পারে, কারণ এতে মস্তিষ্কের বিকাশে ব্যাঘাত ঘটার ঝুঁকি থাকে। তাই তাদের রিডিং বড়দের তুলনায় কিছুটা শিথিল রাখা হয়। সাধারণত খাওয়ার আগে শিশুদের সুগার ৯০-১৩০ mg/dL এবং খাওয়ার পর ১৫০ mg/dL এর মধ্যে রাখা আদর্শ। যদি কোনো শিশু অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভব করে বা ঘনঘন প্রস্রাব করে, তবে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
গর্ভবতী মায়েদের ডায়াবেটিস লেভেল
গর্ভাবস্থায় প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল থেকে নিঃসৃত কিছু হরমোন মায়ের শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, যাকে Insulin Resistance বলা হয়। এর ফলে অনেক মায়ের রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়, যা Gestational Diabetes (GDM) নামে পরিচিত। মা ও শিশুর সুরক্ষায় এই সময়ে সুগার নিয়ন্ত্রণ রাখা অত্যন্ত জরুরি।
যদি গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তবে শিশুর জন্মের সময় অতিরিক্ত ওজন (Macrosomia), সময়ের আগে প্রসব (Preterm birth) বা জন্মের পর শিশুর সুগার কমে যাওয়ার মতো জটিলতা হতে পারে। তাই এই সময়ে লক্ষ্য হওয়া উচিত খালি পেটে সুগার ৯৫ mg/dL এর নিচে এবং খাওয়ার ১ ঘণ্টা পর ১৪০ mg/dL এর মধ্যে রাখা। নিয়মিত সুগার চেক করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শে সঠিক ডায়েট চার্ট অনুসরণ করাই নিরাপদ মাতৃত্বের পূর্বশর্ত। সচেতনতাই পারে একটি সুস্থ ও সুন্দর আগামীর নিশ্চয়তা দিতে।
খালি পেটে বনাম ভরা পেটে সুগারের মাত্রা: পার্থক্য ও গুরুত্ব
ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনায় সুগার মাপার দুটি প্রধান সময় হলো Fasting (খালি পেটে) এবং Postprandial বা PP (খাওয়ার ২ ঘণ্টা পর)। এই দুটি পরীক্ষার ফলাফল চিকিৎসকদের শরীরের ইনসুলিন ব্যবহারের ধরন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়। ফাস্টিং সুগার মূলত নির্দেশ করে আমাদের লিভার রাতে কতটুকু গ্লুকোজ তৈরি করছে। অন্যদিকে, পিপি বা ভরা পেটে সুগারের মাত্রা বলে দেয় আমাদের শরীর খাবারের কার্বোহাইড্রেট কতটুকু কার্যকরভাবে প্রসেস করতে পারছে।
একটি বিশেষ বিষয় হলো 'Dawn Phenomenon' বা 'ভোরের আভা'। অনেক সময় দেখা যায়, সারারাত কিছু না খেলেও ভোরে হঠাৎ সুগারের মাত্রা বেড়ে গিয়েছে। এটি সাধারণত ভোর ৪টা থেকে ৮টার মধ্যে ঘটে। শরীরের কিছু হরমোন (যেমন কর্টিসল ও গ্রোথ হরমোন) ইনসুলিনকে বাধা দেয় এবং লিভারকে গ্লুকোজ ছাড়তে উদীপ্ত করে, যার ফলে খালি পেটে সুগার বেশি আসতে পারে। এটি কোনো ভুলের কারণে নয়, বরং শরীরের অভ্যন্তরীণ একটি জৈবিক প্রক্রিয়া।
তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেবল ফাস্টিং নয়, ভরা পেটে সুগার মাপা সমান গুরুত্বপূর্ণ। এতে গ্লুকোজ স্পাইক (খাওয়ার পর হঠাৎ সুগার বৃদ্ধি) শনাক্ত করা সহজ হয়, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
ভরা পেটে সুগার মাপার জন্য খাওয়ার কতক্ষণ পর টেস্ট করা সঠিক?
উত্তর: ভরা পেটে বা পিপি (Postprandial) সুগার মাপার সবচেয়ে আদর্শ সময় হলো খাবার শুরু করার ঠিক ২ ঘণ্টা পর। এই সময়ে রক্তে শর্করার মাত্রা শিখরে পৌঁছায় এবং এরপর আবার কমতে শুরু করে, তাই ২ ঘণ্টা পর মাপলে সবচেয়ে নির্ভুল ফল পাওয়া যায়।
বিপদজনক সুগার লেভেল কখন হাসপাতালে যাবেন?
রক্তে শর্করার মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া (Hyperglycemia) বা অনেক বেশি কমে যাওয়া (Hypoglycemia)—উভয়ই জীবনহানিকর হতে পারে। এই পরিস্থিতিগুলোকে মেডিকেল ইমার্জেন্সি হিসেবে গণ্য করা হয়। নিচে কিছু জরুরি 'Red Flag' লক্ষণ দেওয়া হলো যা দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে:
হাইপোগ্লাইসেমিয়া (সুগার ৪-এর নিচে):
প্রবল ঘাম হওয়া এবং শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া।
বুক ধড়ফড় করা এবং হাত-পা কাঁপা।
তীব্র ক্ষুধা এবং হঠাৎ মেজাজ খিটখিটে হওয়া।
কথা জড়িয়ে যাওয়া বা জ্ঞান হারানো।
হাইপারগ্লাইসেমিয়া (সুগার ১৫-২০ এর উপরে):
অস্বাভাবিক তৃষ্ণা এবং বারবার প্রস্রাব হওয়া।
নিশ্বাসে ফলের মতো মিষ্টি গন্ধ (Ketoacidosis এর লক্ষণ)।
তীব্র পেট ব্যথা এবং বমি বমি ভাব।
ঝাপসা দেখা বা প্রচণ্ড মানসিক বিভ্রান্তি।
যদি সুগার লেভেল হঠাৎ অস্বাভাবিক হয়ে যায় এবং রোগী অজ্ঞান হওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছায়, তবে কোনো ঘরোয়া টোটকার অপেক্ষা না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যোগাযোগ করুন।
সুগার লেভেল ২০ এর উপরে চলে গেলে তাৎক্ষণিক করণীয় কী?
উত্তর: যদি সুগার ২০ mmol/L এর বেশি হয়, তবে প্রথম কাজ হলো প্রচুর পরিমাণে সাধারণ পানি পান করা যাতে শরীর থেকে অতিরিক্ত গ্লুকোজ প্রস্রাবের মাধ্যমে বেরিয়ে যেতে পারে। এরপর কোনো দেরি না করে দ্রুত আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইনসুলিন ডোজ সমন্বয় করুন অথবা হাসপাতালে যান।
ইনসুলিন কি
ইনসুলিন হলো আমাদের শরীরের প্যানক্রিয়াস (Pancreas) বা অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত এক প্রকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমোন। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এটি শরীরের একটি 'মাস্টার কি' বা চাবি হিসেবে কাজ করে। আমরা যখন খাবার খাই, শরীর তা ভেঙে গ্লুকোজ (Glucose)-এ রূপান্তর করে। এই গ্লুকোজ রক্তের মাধ্যমে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু কোষগুলো সরাসরি এটি গ্রহণ করতে পারে না।
ইনসুলিন হরমোন তখন কোষের দরজা খুলে দেয় যাতে গ্লুকোজ ভেতরে ঢুকে আমাদের শক্তি (Energy) জোগাতে পারে। যখন শরীরে পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি হয় না বা কাজ করতে পারে না, তখন রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায় এবং ডায়াবেটিস দেখা দেয়। সঠিক মাত্রায় ইনসুলিন না থাকলে শরীরের কোষগুলো শক্তির অভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
ডায়াবেটিস কত হলে ইনসুলিন নিতে হয়?
ইনসুলিন নেওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না, বরং শরীরের সামগ্রিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। তবে কিছু Educational thresholds বা মাত্রা রয়েছে যা ইনসুলিন শুরুর ইঙ্গিত দেয়। সাধারণত বারবার খালি পেটে (Fasting) সুগার ১৩০ mg/dL এর বেশি এবং খাওয়ার পর (PP) ২০০ mg/dL এর উপরে থাকলে ডাক্তার ইনসুলিন বিবেচনা করেন। বিশেষ করে যদি আপনার HbA1c লেভেল ৮-৯% এর বেশি থাকে এবং মুখে খাওয়ার ওষুধ (Tablets) আর কাজ না করে।
টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য শরীরে ইনসুলিন তৈরি হয় না বলে এটি শুরু থেকেই বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে, টাইপ-২ রোগীদের ক্ষেত্রে যখন লাইফস্টাইল পরিবর্তন ও ওষুধের সর্বোচ্চ মাত্রাও ব্যর্থ হয়, তখন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সুরক্ষিত রাখতে ইনসুলিনই প্রধান ভূমিকা পালন করে। মনে রাখবেন, রক্তে শর্করার পরিমাণ ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে, তাই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া Self-medication বা নিজে নিজে ইনসুলিন শুরু করা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
HbA1c টেস্ট কী এবং এর রেজাল্ট চার্ট
ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনায় HbA1c (Hemoglobin A1c) টেস্টকে 'গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড' বলা হয়। প্রতিদিনের গ্লুকোমিটার রিডিং কেবল মুহূর্তের সুগার লেভেল জানায়, কিন্তু HbA1c আপনার রক্তে গত ৯০ দিনের বা ৩ মাসের গড় শর্করার পরিমাণ প্রকাশ করে। লোহিত রক্তকণিকার হিমোগ্লোবিনের সাথে কতটুকু চিনি লেগে আছে, এটি মূলত সেই চিত্র তুলে ধরে। যেহেতু রক্তের কোষগুলো সাধারণত ৩ মাস বাঁচে, তাই এই পরীক্ষাটি শর্করার একটি নিখুঁত গড় প্রদান করে।
HbA1c রেজাল্ট চার্ট:
স্বাভাবিক (Normal): ৫.৭% এর নিচে।
প্রি-ডায়াবেটিস: ৫.৭% থেকে ৬.৪%।
ডায়াবেটিস: ৬.৫% বা তার উপরে।
অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস: ৮% থেকে ১০%+।
আপনার HbA1c লেভেল ৭% এর নিচে রাখা মানে আপনি ডায়াবেটিস জনিত জটিলতা থেকে নিরাপদ আছেন।
HbA1c টেস্ট করার জন্য কি খালি পেটে থাকতে হয়?
উত্তর: না, HbA1c পরীক্ষার জন্য খালি পেটে থাকা বা ফাস্টিং করা জরুরি নয়। এটি দিনের যেকোনো সময় করা যায় এবং খাবারের কারণে এর ফলাফলে কোনো তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আসে না।
সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণে রাখার কার্যকরী ঘরোয়া উপায়
ডায়াবেটিস কেবল ওষুধ দিয়ে নয়, বরং সঠিক জীবনধারার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। গবেষণায় দেখা গেছে, Low-carb Diet বা শর্করা কম জাতীয় খাবার গ্রহণ করলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স দ্রুত কমে। যখন আমরা ভাত বা রুটির বদলে শাকসবজি ও প্রোটিন বেশি খাই, তখন রক্তে গ্লুকোজের হঠাৎ বৃদ্ধি (Spike) ঘটে না। এর পাশাপাশি নিয়মিত Physical Activity বা ব্যায়াম পেশির সুগার গ্রহণের ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়, যা ব্যায়ামের পরবর্তী ২৪-৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কার্যকর থাকে।
মানসিক চাপ বা Stress Management আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করলে শরীরে কর্টিসল হরমোন নিঃসরণ হয়, যা সরাসরি রক্তে সুগার বাড়িয়ে দেয়। তাই পর্যাপ্ত ঘুম (৭-৮ ঘণ্টা) এবং ইয়োগা বা মেডিটেশন সুগার নিয়ন্ত্রণে দারুণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশে সহজে পাওয়া যায় এমন কিছু উচ্চ ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার রক্তে চিনি শোষণের গতি কমিয়ে দেয়। যেমন:
লাল চাল ও লাল আটা।
সবুজ শাকসবজি (পালং শাক, কলমি শাক, লাউ)।
খোসাযুক্ত ফল (পেয়ারা, আমড়া)।
বিভিন্ন ধরণের ডাল ও শিমের বিচি।
এসব অভ্যাস আপনার মেটাবলিজম উন্নত করে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায়।
করলার রস বা মেথি কি সত্যিই ইনসুলিনের বিকল্প হতে পারে?
উত্তর: না, করলার রস বা মেথি ভেজানো পানি রক্তে সুগার কমাতে কিছুটা সহায়ক (Supplementary) হতে পারে, তবে এগুলো কখনোই ডাক্তার নির্ধারিত ওষুধ বা ইনসুলিনের বিকল্প নয়। এগুলোকে সাপ্লিমেন্ট হিসেবে গ্রহণ করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ডায়াবেটিস সংক্রান্ত সাধারণ প্রশ্ন উত্তর (FAQs)
১. সুগার কত হলে ডায়াবেটিস বলা হয়?
খালি পেটে সুগার ১২৬ mg/dL (৭.০ mmol/L) বা তার বেশি এবং খাওয়ার ২ ঘণ্টা পর ২০০ mg/dL (১১.১ mmol/L) বা এর বেশি হলে তাকে ডায়াবেটিস বলা হয়।
২. মিষ্টি না খেলেও কি ডায়াবেটিস হতে পারে?
হ্যাঁ। অতিরিক্ত শর্করা (ভাত, রুটি), শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, বংশগত কারণ এবং মানসিক চাপের ফলেও ডায়াবেটিস হতে পারে। কেবল চিনি বা মিষ্টিই একমাত্র কারণ নয়।
৩. ডায়াবেটিস কি চিরতরে নিরাময় হয়?
টাইপ-২ ডায়াবেটিস পুরোপুরি নিরাময় না হলেও জীবনযাত্রা ও ডায়েট পরিবর্তনের মাধ্যমে 'রিমিশন' (Remission) বা ওষুধ ছাড়াই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে টাইপ-১ নিরাময়যোগ্য নয়।
৪. রাতে ঘুমানোর আগে সুগার কত থাকা সেফ?
সাধারণত রাতে ঘুমানোর আগে সুগার ১০০-১৪০ mg/dL এর মধ্যে থাকা নিরাপদ। এটি খুব বেশি কমে গেলে রাতে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি থাকে।
৫. সুগার হঠাৎ কমে গেলে দ্রুত কী খাবেন?
দ্রুত ১৫ গ্রাম দ্রুত শোষিত হয় এমন কার্বোহাইড্রেট যেমন—৩ চামচ চিনি মেশানো পানি, আধা কাপ ফলের জুস অথবা গ্লুকোজ ট্যাবলেট খান।
৬. গ্লুকোমিটারে সুগার মাপার সঠিক নিয়ম কী?
প্রথমে হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে শুকিয়ে নিন। আঙুলের ডগার একদম মাঝখানে নয়, বরং একটু পাশে ল্যানসেট দিয়ে প্রিক করুন। স্ট্রিপে পর্যাপ্ত রক্ত দিন এবং নিয়মিত গ্লুকোমিটারটি ক্যালিব্রেট করুন।
